সুরুল সরকার বাড়ির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস - পাঠকের কলম । - News2news India

News2news India

India's leading news portal.

Breaking

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Tuesday, October 16, 2018

সুরুল সরকার বাড়ির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস - পাঠকের কলম ।

চিত্র সৌজন্যে :- নবনীতা সরকার।
                          পাঠকের কলম
নবনীতা সরকার :- সুরুল সরকার বাড়ির আদি পুরুষ ভারতচন্দ্র সরকার (ঘোষ) বাস করতেন বর্ধমান শহরের পশ্চিমে বাঁকা নদীর তীরে অবস্থিত নীলপুর গ্রামে। সহধর্মিণীর নাম ছিল বিমলা। ভারতচন্দ্র সরকার (ঘোষ) জাতিতে ছিলেন কোঁয়ার- সদগোপ। এই দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান। সন্তান লাভের আশায় তাঁর গুরুদেব সুরুলের বাসুদেব ভট্টাচার্য মহাশয়ের আদেশে অষ্টাদশ শতকের প্রথমদিকে সুরুল গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। সুরুল ছিল তাঁর শ্রীপাট।
এরপর ভারতচন্দ্র সরকার ও বিমলা দেবীর একটি পুত্র সন্তান হয়, নাম কৃষ্ণহরি সরকার। এরপর ভারতচন্দ্র সরকার পাকাপাকি ভাবেই সুরুলে বসবাস শুরু করেন।

কৃষ্ণহরি সরকারের তিন পুত্র, যাদবেন্দ্র, মাধবেন্দ্র ও কালীচরণ। যাদবেন্দ্র সরকারের বংশধরেরা হলেন বড়বাড়ির এবং মাধবেন্দ্র সরকারের বংশধরেরা হলেন ছোট বাড়ির। কালীচরণের বংশধরেরা বড়বাড়ির সাথেই যুক্ত হন। কৃষ্ণহরি সরকার অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি পঞ্চরত্ন মন্দির নির্মাণ করেন ও লক্ষ্মী নারায়ণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিত্যপুজোর সূচনা করেন। তাঁর অনুমতিতেই দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়।

যাদবেন্দ্র সরকারের দুই পুত্র ব্রজবল্লভ ও রাজবল্লভ। ব্রজবল্লভ চীপ সাহেবদের সাথে ব্যবসা করে প্রভূত অর্থ সম্পত্তি উর্পাজন করেন। ব্রজবল্লভের পাঁচ সন্তান বৈদ্যনাথ, রামনারায়ণ, শ্রীনিবাস, লক্ষ্মীকান্ত ও গুরুচরণ। ব্রজবল্লভের পুত্ররাই প্রধানত সরকার পরিবারের উন্নতিতে মুল ভূমিকা পালন করেন। এঁদের মধ্যে তৃতীয় ভ্রাতা শ্রীনিবাস সরকার তাঁর বৈষয়িক বুদ্ধি, কর্মদক্ষতা, সুচারুতার দ্বারা সরকার বংশের যশ, প্রতিপত্তি, সৌভাগ্য সুনাম অর্জনে অগ্রনী হন।

সময়টা ছিল অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ। ১৭৬৮ খৃষ্টাব্দে মন্ -লি- সিনর (Mon-Le-Seigneur) বীরভূমে এসে আনন্দ চন্দ্র গোস্বামীর কাছ থেকে কয়েক বিঘা জমি গ্রহণ করেন। এই সময়টাতেই ১৮৭২ খৃষ্টাব্দে ইষ্ট ইন্ডিয়া কম্পানী সুরুল গ্রামের উত্তর দিকে একটি কুঠী বা আড়ং নির্মাণ করেন। মিঃ চীপ ( Mr John Cheap) Bengal Civil Service এর অফিসার হিসাবে বীরভূমে সর্বপ্রথম রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। এখানেই তিনি সুবিশাল ব্যবসাকেন্দ্র স্থাপন করেন। স্থানীয় তাঁতিরা চরকা কাটা খদ্দেরের কাপড় তৈরী করত, সেগুলিকে স্থানীয় ভাবে 'গড়েথান' বলা হত। এইসমস্ত থান গুলি এই কুঠিবাড়িতে জমা হত। এই কাপড়গুলি তৎকালীন সিংহল, রেঙ্গুন, মিশর, ইউরোপে রপ্তানি করা হত।

চীপসাহেবের এই কুঠিতে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে শ্রীনিবাস সরকার কাপড়ের এই ব্যবসা শুরু করেন এবং প্রভূত অর্থ উপার্জন করেন। কথিত আছে, তিনি এই ব্যবসায় ১৮ লক্ষ টাকা উপার্জন করেন। চীপসাহেবের সাথে এই পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ছিল যথেষ্ট। তৎকালীন সময়ে চীপসাহেব ও ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের তিনি বিভিন্ন জিনিস দিয়ে সাহায্য করেন। এই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলের স্বজাতিদের নিয়ে ছয়মাস ব্যাপী একটি বড় সামাজিক তথা ধর্মীয় সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই সভায় শ্রীনিবাস সরকার বিশেষ অগ্রনী ভূমিকা নেন এবং তাঁকে বৈশ্য সমাজের নেতারূপে সকলে নির্বাচন করেন।

শ্রীনিবাস সরকার ১২২২ বঙ্গাব্দে মনোহরশাহী পরগানার জমিদার স্বরূপচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর তার ভ্রাতা গোপাল চন্দ্র রায়ের কাছ থেকে পত্তনি তালুকের লাট গোমড়ার ১৩ টি মৌজা এবং বর্ধমান জেলার মহারাজা প্রতাপচন্দ্রের জমিদারী থেকে ১২২৪ বঙ্গাব্দে চম্পানগরী কিনে নেন। শ্রীনিবাস সরকারের অগ্রজ রামনারায়ণ সরকার মহারাজা মহঃ জমা খাঁয়ের কাছ থেকে বারবক সিংহ পরগানার ৯টি মৌজার বেশ কিছুটা জমিদারী অংশ কিনে নেন ১২০৪ সালে। রামলোচন সরকার ইলামবাজারের বণিক কুঠিতে লাক্ষার ব্যবসা করে উন্নতি সাধন করেন।

কৃষ্ণহরি সরকার যিনি দুর্গাপুজোর প্রবর্তন করেন, তখন মন্দির ছিল মাটির তৈরী। শ্রীনিবাস সরকার ও তার ভাইয়েরা মিলে অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে এই মাটির দুর্গামন্দির ভেঙে পাকা ইমারত তৈরী করেন। তৈরী করতে খরচ হয়েছিল ১৮ হাজার টাকা। নদিয়া জেলার রানাঘাট নিবাসী গোবিন্দ মিস্ত্রী তিন টাকা চার আনা বেতনে এই মন্দির, দুর্গাদালান, চকমিলান দালান নির্মাণ করেন। এছাড়াও অন্যান্য দেবদেবীর মন্দির, কাছারিবাড়ি, পুষ্করিণী, বাগানবাড়ি ইত্যাদি নির্মাণ করতে প্রায় ২ লক্ষ টাকা খরচ হয়। ১২০৩-১২০৪ বঙ্গাব্দে সেনা রাণীর কাছ থেকে পাঁচটি লাট কিনে নেন তারা। এর মধ্যে তিনটি জাতীয় ও দুইটি দেবোত্তর।

সরকার বাড়ির ব্যবসার সাথে যুক্ত শ্রীনাথ শর্মা বন্দোপাধ্যায়, রামমোহন শর্মা, বিশ্বনাথ সিংহ এবং বঙ্গছত্র নিবাসী মোক্তার দীননাথ সরকার এদের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। রামনারায়ণের কনিষ্ঠ পুত্র আশানন্দ সরকার নীল, চিনি ও গড়াকাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। এইসুত্রে রাইপুরের জমিদার ভুবনমোহন সিংহ মহাশয়ের সাথে কিছু বিবাদ তৈরী হয়।

সরকার পরিবার বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথেও যুক্ত ছিল৷ বাঁধগোড়া স্কুল নির্মাণে মনমোহন সরকার বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। স্কুলের ইমারত থেকে শুরু করে শিক্ষকদের বেতনের টাকা বাবদ মাসিক ২০ টাকা হিসাবে দেওয়া হত। বোলপুর হাই স্কুল নির্মাণেও সরকার বাড়ি থেকে সাহায্য করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন দরবেশ এবং বৈষ্ণব সেবা, সাধু সন্ন্যাসীদের দান, বা গরিব দুঃখি মানুষকে সাহায্য করা হত।

শান্তিনিকেতন ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথেও সরকার বাড়ির যোগাযোগ ছিল। এইসুত্রে কার্ত্তিক চন্দ্র সরকারের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এনার সাথে দ্বীপেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ যোগাযোগ ছিল। বিশ্বভারতীর শ্রীনিকেতনে বিভিন্ন বিভাগ গুলি তৈরীতে সরকার বাড়ির জমি দানের উল্লেখ পাওয়া যায়।

কৃষ্ণহরি সরকার দুর্গা পুজোর সূচনা করলেও যাদবেন্দ্র সরকার এই পুজোকে আরো সুষ্ঠু ও নিয়ম মেনে শুরু করেন। পুজোর খরচের জন্য জমিদারী থেকে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। এর জন্য দুটি লাটের আয় দেবোত্তর হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল।১৮৩৩ সালে দুর্গা পুজোর সময় ছয়দিন ব্যাপি যে যাত্রা গান হয়েছিল তাতে খরচ হয়েছিল ৪২ টাকা।

সরকার পরিবারের বিশিষ্ট কিছু ব্যক্তিত্বের উল্লেখ করা যায়। এদের মধ্যে ভুবনমোহন সরকার ছিলেন স্থাপত্য শিল্পী, মনমোহন সরকার ছিলেন বোলপুর হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা, হরিমোহন সরকার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শান্তিনিকেতনের সাথে যুক্ত ছিলেন, আশুতোষ সরকার ডেপুটি মেজিষ্ট্রেট ছিলেন, কার্ত্তিকচন্দ্র সরকার কমন ম্যানেজার ও গায়েত্রী, পথের আভাস ইত্যাদি গ্রন্থের প্রণেতা, দেবেন্দ্রনাথ সরকার বর্ধমানের খ্যাতনামা উকিল এবং ছোটো বাড়ির পুজো স্বতন্ত্র ভাবে প্রচলন করেন, কান্তিভূষণ সরকার কমন ম্যানেজার (দেবোত্তর এষ্টেট), রায় সাহেব নরেন্দ্রনাথ সরকার ইঞ্জিনিয়ার, প্রণবেশ্বর সরকার উকিল, রয়েল ক্লাব প্রতিষ্ঠাতা, বর্ধমান পৌরসভার সভাপতি এবং ছোটো বাড়ির পাকা দুর্গা মন্দির নির্মাতা।

সরকার বাড়ির দুর্গা পুজো আজও প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। রাজকীয় মর্যাদা ও বনেদিয়ানায় আজও দেবীর আহ্বান ও বিসর্জন করা হয়। চতুর্দোলায় চড়ে দেবী মন্দিরে প্রবেশ করেন। পূজা, হোম, বলিদান, আরতি দর্শনে দূর দূরান্তের দর্শনার্থী ভক্তদের আগমন ঘটে। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে রাত্রে যাত্রাগান হয়। নবমীর দিন সাঁওতাল নাচের ইতিহাসও পুরনো, যা আজও চলে আসছে। পুজো উপলক্ষে এখানে ছোটো একটা মেলাও বসে। ঐতিহ্যবাহী ঝাড়-লণ্ঠনের বিচ্ছুরন আজও অমলিন। সানাই আর ঢোলের সুর আজও সমান সাযুজ্য বয়ে নিয়ে চলেছে।

দেবী দুর্গা ছাড়াও সরকার বাড়ির প্রতিষ্ঠিত আরও অনেক দেবদেবী আছেন। লক্ষ্মী জনার্দন, শ্রীনিকেতনে কালীসায়েরর মা কালিকা, শ্রী শ্রী শ্যামসুন্দর, শিবলিঙ্গ, ধর্মরাজ এই সমস্ত দেবতার অধিষ্ঠান আছে এবং এই সকল দেবতার নিত্যপুজোর ব্যবস্থা আছে।

এই বছর দুর্গা পুজো ২৮৪ তম বছর এ পদার্পণ করল। দেবীকে সাবেকি ডাকের সাজে সাজানো হয়। সোনার অলঙ্কারে দেবী সজ্জিতা হন। আজও সরকার বাড়ির দুর্গা পুজো ঐতিহ্য, সাবেকিয়ানা এবং নিয়ম নিষ্ঠার সাথে করা হয়। দেবী দুর্গাই জগৎজ্জননী মা এবং সকল বিপদের পরিত্রাতা এই বিশ্বাস আজও সকলের মনে অমলিন ও চিরন্তন।
এই প্রতিবেদনটি পাঠকের কলম বিভাগে প্রকাশিত।

No comments:

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here